পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য: ICT@School প্রকল্পের শিক্ষকরা কেন উপেক্ষিত?

বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক ধরনের বেদনাদায়ক বৈষম্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। ICT@School প্রকল্পের অধীনে নিয়োজিত শিক্ষকরা বছরের পর বছর ধরে সীমিত বেতন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সাথে সংগ্রাম করে চলেছেন। অথচ একই প্রকল্পের বিভিন্ন পর্বে (ফেজে) নিযুক্ত শিক্ষকরা একেবারে আলাদা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি কেবল অসাম্যকেই তুলে ধরে না, বরং একটি বৃহৎ প্রশ্ন তোলে—একই কাজের জন্য কীভাবে পৃথক মূল্যায়ন হতে পারে?




প্রকল্পের পরিপ্রেক্ষিত

ICT@School প্রকল্পটি কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল স্কুল পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ দেওয়া। এই প্রকল্পের অধীনে পর্যায়ক্রমে ফেজ ১ থেকে ফেজ ৬ পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে।

এই শিক্ষকরা প্রতিটি স্কুলে কম্পিউটার শিক্ষা, ডিজিটাল লিটারেসি এবং স্কুলের অন্যান্য প্রযুক্তি-সম্পর্কিত কাজ করে থাকেন। অনেক সময় তারা নেটওয়ার্কিং, প্রজেক্টর পরিচালনা, মেইন্টেন্যান্স এবং শিক্ষকদের ডিজিটাল সহায়তাও করে থাকেন। সহজভাবে বললে, স্কুলের ‘টেকনোলজিকাল ব্যাকবোন’ এই শিক্ষকরাই।


বেতন বৈষম্য: বাস্তব চিত্র

তবে প্রকৃত সমস্যাটি শুরু হয় যখন দেখা যায় একই প্রকল্পের অধীনে কাজ করেও ফেজ ১-৪ এর শিক্ষকরা প্রায় ₹২৫,০০০ বা তার বেশি বেতন পাচ্ছেন, অথচ ফেজ ৫ ও ৬ এর শিক্ষকরা মাত্র ₹৭,৯৫৯ টাকায় কাজ করে যাচ্ছেন। এই বৈষম্য কোনো যৌক্তিক নিয়ম মেনে হয় না, বরং এটি একটি খোলামেলা অবিচার।

প্রশ্ন ওঠে, একজন ফেজ ৫ বা ফেজ ৬ এর শিক্ষক, যিনি প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে শিশুদের কম্পিউটার শিক্ষা দিচ্ছেন, প্রযুক্তিগত সহায়তা করছেন, তিনিই কেন একই পরিশ্রম করেও কম বেতন পাবেন?




ন্যায্যতার অভাব

এই বৈষম্য কেবল আর্থিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানসিক এবং সামাজিক দিক থেকেও ক্ষতিকর। যারা ফেজ ৫ বা ৬-এ নিযুক্ত, তারা নিজেদের পেশাগত সম্মান, স্থায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই শিক্ষকরা প্রায়শই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অবিচার ও অবহেলার শিকার হন।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি হারানো গ্রুপ-D এবং গ্রুপ-C কর্মীদের আবার আর্থিক সহায়তা হিসেবে ₹২০,০০০ এবং ₹২৫,০০০ করে দেওয়া হচ্ছে। অবশ্যই মানবিকতার খাতিরে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য, কিন্তু প্রশ্ন থাকে—তাহলে দীর্ঘদিন প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষকতা করে যাওয়া ICT শিক্ষকরা কেন এই বঞ্চনার শিকার?


সমাজ ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি

সমাজের একটি বড় অংশ ICT শিক্ষকদের প্রকৃত অবদান সম্পর্কে অবগত নয়। অনেকেই ভাবেন, তারা শুধুই ‘কম্পিউটার অপারেটর’। বাস্তবে তাদের কাজ অনেক বিস্তৃত। এমনকি অনেক সময় তারা মিড-ডে মিলের হিসাব, ছাত্রছাত্রীদের নাম এন্ট্রি, পরিসংখ্যান জমা ইত্যাদির দায়িত্বও পালন করেন।

সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো স্থায়ী নীতি নেওয়া হয়নি যা এই প্রকল্পের শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে। বারবার বিভিন্ন সভা-সমিতিতে দাবি জানানো সত্ত্বেও কোনও স্থায়ী সমাধান আসে না।


শিক্ষকদের দাবি কী?

ICT@School প্রকল্পের অধীনে ফেজ ৫ ও ৬-এ নিযুক্ত শিক্ষকরা মূলত কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছেন:

  1. সমান বেতন – একই প্রকল্পের অধীনে একই কাজের জন্য সকল শিক্ষককে সমান বেতন দিতে হবে।

  2. স্থায়ীকরণ – দীর্ঘদিন ধরে নিয়োজিত শিক্ষকদের জন্য স্থায়ী পদ বা অন্তত কন্ট্রাকচুয়াল নীতির আওতায় নিয়ে আসা।

  3. নবীকরণ এবং আপগ্রেডেশন – শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত আপডেট দেওয়ার ব্যবস্থা।

  4. সামাজিক স্বীকৃতি – মিডিয়া ও সরকারের পক্ষ থেকে তাদের গুরুত্ব তুলে ধরা।




উপসংহার

একটি সমাজ তার শিক্ষকদের কদর না করলে সেই সমাজের ভবিষ্যৎ কখনই উজ্জ্বল হতে পারে না। ICT@School প্রকল্পের শিক্ষকরা একান্তভাবে এই সমাজের প্রযুক্তি-শিক্ষা ভিত্তি তৈরি করছেন। তারা কেবল ক্লাস নিচ্ছেন না, বরং এক নতুন যুগের জন্য ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুত করছেন।

অতএব, এখন সময় এসেছে যে সরকার এবং সমাজ দুই-ই তাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাক। তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে ন্যায্য পারিশ্রমিক, স্থায়ীত্ব এবং সম্মান দেওয়া হোক। আর সবচেয়ে বড় কথা—একই রাস্তায় হেঁটে যারা স্কুলে কাজ করছেন, তাদের ফলাফল যেন পৃথক না হয়।