পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে কর্মরতদের বঞ্চনা: ICT প্রকল্পের বাস্তবতা ও এক গভীর বৈষম্যের চিত্র

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর বৈষম্যের নজির উঠে এসেছে, যা সমাজের বহু মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। একদিকে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অবৈধ ঘোষণা করা নিয়োগপ্রাপ্তদের (GROUP-D এবং GROUP-C) জন্য সরকার যে সহানুভূতি ও আর্থিক সহযোগিতা দেখাচ্ছে, অন্যদিকে সেখানে বছরের পর বছর কাজ করেও ICT@School প্রকল্পের আওতায় কর্মরত শিক্ষকদের প্রতি সেই আন্তরিকতা ও ন্যায্যতা দেখা যাচ্ছে না।

এই ব্লগে আমরা সেই বৈষম্য এবং বর্তমান ICT কর্মীদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব।




সুপ্রিম কোর্টের রায় ও সরকারের প্রতিক্রিয়া

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া বেশ কিছু GROUP-D ও GROUP-C কর্মীকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে চাকরি থেকে অযোগ্য ঘোষণা করে। স্বাভাবিকভাবেই, এই সিদ্ধান্তের ফলে হাজার হাজার কর্মী চাকরি হারানোর আশঙ্কায় পড়েন। কিন্তু এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার এমন এক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

সরকার ঘোষণা করেছে যে চাকরিচ্যুত হওয়া ব্যক্তিদের জন্য GROUP-D কর্মীদের প্রতি মাসে ₹২০,০০০ এবং GROUP-C কর্মীদের ₹২৫,০০০ করে ভাতা প্রদান করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তার দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি মানবিক মনে হলেও, প্রশ্ন উঠে আসে তখনই যখন একই রাজ্যের ICT প্রকল্পে কাজ করে যাওয়া প্রকৃত শিক্ষক ও টেকনিক্যাল সহায়করা এর চেয়ে অনেক কম বেতন পাচ্ছেন, অথচ তাদের কাজ এবং দায়িত্ব কোনো অংশেই কম নয়।




ICT@School প্রজেক্ট: এক উপেক্ষিত বাস্তবতা

ICT@School প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যার লক্ষ্য স্কুল স্তরে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং ডিজিটাল শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া। এই প্রকল্পে নিযুক্ত কর্মীরা প্রতিদিন ছাত্রছাত্রীদের কম্পিউটার শিক্ষায় সহায়তা করেন, ল্যাব পরিচালনা করেন, যান্ত্রিক সমস্যা মেটান এবং কখনো কখনো শিক্ষকতাও করেন।

এই কর্মীরা উচ্চশিক্ষিত, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং অনেকেই দীর্ঘ ৫ থেকে ১০ বছর ধরে নিরবিচারে কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের মাসিক পারিশ্রমিক মাত্র ₹৭৯৫৯ — যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষিতে একেবারেই অপ্রতুল। নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি, নেই স্থায়ী চাকরির নিশ্চয়তা, এমনকি স্বাস্থ্য বা ভবিষ্যত পেনশন ব্যবস্থাও অনুপস্থিত।

তাহলে প্রশ্ন জাগে — যাঁরা নিয়ম মেনে পরীক্ষা দিয়ে, যোগ্যতা নিয়ে, বছর বছর কাজ করে চলেছেন, তাঁদের প্রতি এই অবহেলার কারণ কী?


বৈষম্যের বাস্তব উদাহরণ

একদিকে যেখানে সুপ্রিম কোর্ট "অবৈধ" নিয়োগ বলে রায় দিয়েছে, সেই নিয়োগপ্রাপ্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেখানে যারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন, তারা পাচ্ছেন না ন্যায্য সম্মান বা পারিশ্রমিক। এটি শুধু বৈষম্য নয়, এটি একপ্রকার সামাজিক অবিচার।

সরকারি চাকরি পাওয়া মানে কেবলমাত্র আর্থিক নিরাপত্তা নয়, এটা সম্মান এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। ICT কর্মীরা সেই সুযোগের অনেকটা বাইরে রয়ে গেছেন। অথচ তাঁরা ক্লাসে উপস্থিত থাকেন, প্রযুক্তির ব্যবহার শেখান, স্কুলের সার্ভার, ইন্টারনেট, প্রজেক্টর, সফটওয়্যার সব কিছু দেখভাল করেন।


মানসিক চাপ ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা

কম বেতনে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে ICT কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই অন্য চাকরি বা পেশার খোঁজে ছুটছেন, কেউ কেউ পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই অবস্থা কেবল একজন কর্মীর নয়, এটি তাঁর পুরো পরিবারের জীবনে প্রভাব ফেলছে।

যদি সরকার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি হারানো কর্মীদের সহায়তার জন্য উদ্যোগ নিতে পারে, তবে ICT প্রকল্পের কর্মীদের জন্য ন্যূনতম সম্মানজনক বেতন কাঠামো ও স্থায়ী করার উদ্যোগ নিতে বাধা কোথায়?


একটি ন্যায্য সমাধান দরকার

সরকারের উচিত অবিলম্বে ICT কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও ন্যায্য নীতি তৈরি করা। তাদের বেতন বৃদ্ধি, স্থায়ীকরণের দিশা এবং সামাজিক সুরক্ষার অন্তর্ভুক্তি অতি জরুরি।

ICT প্রকল্প রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থাকে ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এবং এই কাজে যারা সামনের সারিতে আছেন, তাদের উপেক্ষা করা একেবারেই অনুচিত।




উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেবলমাত্র রাজনৈতিক সুবিধা বা জনমত রক্ষার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা অযৌক্তিক হতে পারে। ICT কর্মীরা কোনো রাজনৈতিক সুবিধার দাবিদার নন, তাঁরা কেবল চান ন্যায্য মজুরি, কাজের স্বীকৃতি, এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

সরকার, শিক্ষাব্যবস্থা, এবং সমাজ— এই তিনের প্রতি আজ তাঁদের একটি প্রশ্ন:

"আমরা যারা নিয়ম মেনে, পরিশ্রম করে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত গড়ার কাজে যুক্ত, আমরা কি এতটাই মূল্যহীন?"

এ প্রশ্নের উত্তর আমরা সকলেই জানি, কিন্তু সেই উত্তর সরকার কবে দেবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।


এই ব্লগটি ICT কর্মীদের প্রতি ন্যায্যতার আহ্বান এবং বৃহত্তর সমাজের কাছে এক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস। যদি আপনি একজন ICT কর্মী হন, বা এমন কাউকে চিনে থাকেন, তবে এই বার্তা পৌঁছে দিন— কারণ পরিবর্তন তখনই আসে, যখন দাবি তৈরি হয়।