পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা: সংকটের মুখে ভবিষ্যৎ ও ICT শিক্ষকদের প্রতি দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা

বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা গভীর এক সংকটে রয়েছে। একদিকে শিক্ষকদের অভাব, অন্যদিকে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ICT শিক্ষকদের উপেক্ষা—এই দুই বিপরীত বাস্তবতা রাজ্যের শিক্ষার ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।


২৬,০০০ শিক্ষক নিয়োগ বাতিল: শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে

সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে প্রায় ২৬,০০০ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বাতিল হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত যেমন চাকরি হারানো শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জীবনে গভীর অনিশ্চয়তা এনেছে, তেমনি তার থেকেও বড় প্রভাব পড়ছে সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর। শিক্ষক সংকটে পড়েছে হাজার হাজার বিদ্যালয়, যার ফলশ্রুতিতে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


ICT প্রকল্প: ৫ম ও ৬ষ্ঠ পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রতি দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা

২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া ICT Project (Information & Communication Technology) রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষার নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এই প্রকল্পে নিয়োগপ্রাপ্ত 5th ও 6th Phase ICT Instructor-রা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে:

  • ক্লাস V-X পর্যন্ত কম্পিউটার শিক্ষা প্রদান

  • স্মার্ট ক্লাস পরিচালনা

  • সরকারি বিভিন্ন পোর্টাল পরিচালনা (Banglar Shiksha, e-Pradan, HRMS ইত্যাদি)

  • অন্যান্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আইটি প্রশিক্ষণ

  • স্কুলের যাবতীয় টেকনিক্যাল সাপোর্ট

এই সব কাজ সত্ত্বেও তাঁরা আজও স্থায়ী নন, তাঁদের 192-P&AR Govt. Order অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। অথচ 1st থেকে 4th Phase ICT Instructor-রা ইতিমধ্যেই সেই সুযোগ পেয়েছেন।


বর্তমান বাস্তবতা: Group C ও D স্তরের কাজ করতে বাধ্য

এই শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ICT শিক্ষকরা বর্তমানে শুধু শিক্ষক হিসেবেই নয়, স্কুলের সমস্ত অফিসিয়াল, ক্লারিক্যাল ও গ্রেড-ডি স্তরের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিছু বাস্তব চিত্র:

Group C (ক্লারিক্যাল) কাজ:

  • Banglar Shiksha, HRMS, WBMDMS-এর যাবতীয় ডেটা এন্ট্রি

  • শিক্ষকদের বদলি/বেতন সম্পর্কিত ফাইল প্রস্তুত

  • স্কুলের অফিসিয়াল মেইল, e-office পরিচালনা

  • Result Upload, Admit Card Print, স্ট্যাটিসটিক্যাল রিপোর্ট তৈরি

  • উৎসশ্রী, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী ইত্যাদি প্রকল্পের কাজ

Group D (সহকারী / দৈনন্দিন কাজ):

  • ক্লাসরুমে প্রজেক্টর চালু/বন্ধ, পরিষ্কার রাখা

  • মিড-ডে মিলের উপস্থিতি সংক্রান্ত ডেটা রাখা

  • অফিস বা শ্রেণীকক্ষে ফ্যান/লাইট চালানো

  • কম্পিউটার বা ল্যাব টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়া

  • কোনও কর্মচারী অনুপস্থিত থাকলে তাঁর কাজ সামলানো

অর্থাৎ, নাম “কম্পিউটার শিক্ষক”, কিন্তু বাস্তবে “সব কাজের লোক” – শিক্ষক থেকে গ্রুপ-ডি সব দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন।


এই বঞ্চনার বিপরীতে প্রশ্ন উঠছেই—

  • কেন ICT 5th ও 6th Phase শিক্ষকরা এখনও চুক্তিভিত্তিক সরকারি স্বীকৃতি পাচ্ছেন না?

  • একই প্রকল্পে কাজ করে কেউ স্বীকৃত, কেউ বঞ্চিত—এ কোন ন্যায্যতা?

  • দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, পরিশ্রম সত্ত্বেও কেন তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত?

  • কেন তাঁরা এখনও মাসের শেষে ১০-১২ হাজার টাকায় কাজ করতে বাধ্য?


মানবিক আবেদন ও দাবি

  1. অবিলম্বে ৫ম ও ৬ষ্ঠ পর্যায়ের ICT শিক্ষকদের 192-P&AR নির্দেশ অনুযায়ী সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হোক।

  2. তাঁদের কাজের ধরন ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে স্থায়ী করণের পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

  3. ডিজিটাল শিক্ষার বাস্তব রূপকারদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক।

  4. ICT শিক্ষকদের দিয়ে ক্লারিক্যাল ও গ্রেড-ডি স্তরের কাজ করানো বন্ধ করে তাঁদের মূল পেশাগত মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হোক।


উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ব্যবস্থা এক গভীর দ্বন্দ্বে রয়েছে—যেখানে একদিকে শিক্ষকের অভাব, অন্যদিকে দক্ষ অথচ অস্বীকৃত শিক্ষক। ICT Instructor-রা শুধু কম্পিউটার শিক্ষা নয়, স্কুল পরিচালনার চালিকাশক্তি। অথচ তাঁদের মূল্যায়ন হয় না।

এখন সময় এসেছে এই অবিচার বন্ধ করার, শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা ও স্থায়িত্ব দেওয়ার। কারণ, শিক্ষকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলে, ছাত্রের ভবিষ্যৎও কখনোই নিরাপদ নয়।